ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নতুন কমিটি

ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ১২:০৫:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ০৩:২৯:১৮ অপরাহ্ন
ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ
বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিইএব) নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার (৩০ আগস্ট) রাতে এই কমিটির অনুমোদন দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। কমিটিতে ৩৩ জন সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে একেবারে নতুন ৯জনকে পদ দেওয়া হয়েছে। 

তবে নতুন এই কমিটি নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। পেশাজীবি সংগঠনে পেশাজীবিরাই উপেক্ষিত, এমন অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, নতুন কমিটির ৩৩ জনের মধ্যে প্রকৃত পেশাজীবী মাত্র সাতজন, যাদের চারজনই অবসরপ্রাপ্ত। আর সদস্য সচিব একজন ব্যবসায়ী।

এছাড়াও অনেককে না জানিয়েই কমিটিতে রাখা হয়েছে। কমিটিতে রাখা হয়েছে আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগীদের। এমনকি, ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীদেরও স্থান দেওয়া হয়েছে কমিটিতে। সবচেয়ে বড় অভিযোগটি উঠেছে আহ্বায়ক  প্রকৌশলী মো. হানিফকে নিয়ে। তিনি একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার বলে জানা গেছে।  একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠনের আহ্বায়ক হওয়ায় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। 

কমিটিতে স্থান পেলেন যাঁরা
আহ্বায়ক  প্রকৌশলী মো. হানিফ। সদস্য সচিব প্রকৌশলী কাজী সাখাওয়াত হোসেন। যুগ্ম আহবায়ক প্রকৌশলী বীর মুক্তিযোদ্ধা মুসলিম উদ্দিন,  প্রকৌশলী ইমাম উদ্দিন,  প্রকৌশলী আবেদুর রহমান, প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম রনি, প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রকৌশলী খাদুমুল হক সোহেল, প্রকৌশলী মো. সোলায়মান ও প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা স্বপন।

সদস্যরা হলেন-  প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম টিপু, প্রকৌশলী মো. বাচ্চু মিয়া,  প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির শামীম, প্রকৌশলী জসিম শিকদার রানা, প্রকৌশলী গাজী মো. সেলিম, প্রকৌশলী সৈয়দ রাশেদুল হাসান রেজা, প্রকৌশলী এইচ এম আমিনুর রহমান, প্রকৌশলী এইচ কে মাহমুদ, প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান, প্রকৌশলী মো. শফিউল আজম সোহেল, প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হোসেন শাকিল, প্রকৌশলী মো. জুয়েল রানা, প্রকৌশলী মো. শাহাদাত হোসেন সবুজ,  প্রকৌশলী মো. বশির উদ্দিন,  প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা মানিক, প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল হামিদ নিরব,  প্রকৌশলী মো. শাহাদাত জামিল চৌধুরী লিল্টন, প্রকৌশলী মো. মিজানুজ্জামাল রুবেল, প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ, প্রকৌশলী কাজী মো. ইলিয়াস, প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান রাহুল ও প্রকৌশলী সেলিমুর রহমান।

একেবারে নতুন যারা
একেবারে নতুন ৯জনকে ডিইএব’র কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন—যুগ্ম আহ্বায়ক ভিপি সোলায়মান, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম রনি, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহেল রানা স্বপন, সদস্য মো. হুমায়ুন কবির শামিম, সদস্য গাজী মো. সেলিম, সদস্য মো. আশরাফুল হোসেন শাকিল, সদস্য কাজী মো. ইলিয়াস, সদস্য মো. শফিউল আজম সোহেল এবং সদস্য মো. মিজানুজ্জামান রুবেল।

নবগঠিত কমিটি নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংগঠনটির পদবঞ্চিতরা। পদবঞ্চিতদের দাবি, নতুন কমিটির ৩৩ সদস্যের কমিটির মধ্যে অন্তত ২৭ জন নেতা নতুন কমিটিকে ভালোভাবে নেননি। ৩১ নং সদস্য কাজী মো. ইলিয়াছ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘তিনি কমিটি সম্পর্কে অবগত নন। এ বিষয়ে তাকে নিয়ে কেউ যাতে ফেসবুকে পোস্ট না করে।’ কয়েকজন পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছেন ।

পদবঞ্চিতরা বলেন, কেবল বিশেষ কয়েকজন নেতার অনুসারীদের সমন্বয়ে এই কমিটি করা হয়েছে। তারা বলেন, এই কমিটি যে কোনো সময় বাতিল হতে পারে। একদিনও নতুন কমিটির কার্যক্রম চলতে দেওয়া হবে না। যাদের দিয়ে নতুন কমিটি করা হয়েছে তারা বিগত ১৫ বছরে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। বেশিরভাগই বিগত কমিটিতে ছিলেন না এবং বিগত কমিটির কয়েকজনকে পদাবনতি করা হয়েছে।

অন্যদিকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং বিগত কমিটির সক্রিয় নেতাদের নতুন কমিটিতে কোনো পদ দেওয়া হয়নি। এটি ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশলীদের চলমান আন্দোলনে এই কমিটি আরও অস্থিরতা তৈরি করবে। কেননা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠনে ডিগ্রিধারীদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক নিজেই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার।

জানা গেছে, শনিবার (৩০ আগস্ট) রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ডিইএব’র ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে প্রকৌশলী মো. হানিফকে আহ্বায়ক এবং প্রকৌশলী কাজী সাখাওয়াত হোসেনকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮ জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ২৩ জনকে সদস্য করা হয়েছে। এই কমিটি ঘোষণার পরপরই বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও ডিইএব’র বিগত কমিটির নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

আগের কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব প্রকৌশলী মীর হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ডিইএব একটি পেশাজীবি সংগঠন। পেশাজীবি সংগঠনে পেশাজীবিরাই উপেক্ষিত। নতুন কমিটির ৩৩ জনের মধ্যে প্রকৃত পেশাজীবী মাত্র ০৭ জন, আবার এই সাত জনের চারজনই অবসরপ্রাপ্ত। সদস্য সচিব একজন ব্যবসায়ী।

নতুন কমিটিতে পদবঞ্চিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতা অভিযোগ করে বলেন, তারা বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে হামলা-মামলা মোকাবিলা করে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করেছেন। অথচ তাদের বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের দোসরদের সমন্বয়ে ডিইএব’র নতুন কমিটি করা হয়েছে, যা ত্যাগী ও কারা নির্যাতিত নেতাকর্মী এবং শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি বলে তারা জানান।

পদবঞ্চিত নেতা ও বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া রুবেল বলেন, নতুন কমিটিতে অনেক নতুন লোককে পদ দেওয়া হয়েছে। এখানে একটি গ্রুপের লোকদের পদায়ন করা হয়েছে। অনেকেই বিগত দিনে আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ছিল। অথচ আমি আওয়ামী লীগ আমলে চাকরি হারিয়েছি, জেল খেটেছি, রাজপথের আন্দোলনে ছিলাম তবুও আমাকে কমিটিতেই রাখা হয়নি। এসব ঘটনায় জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

এদিকে ডিইএব’র কমিটি স্থগিত করার দাবিতে তারেক রহমানের কাছে আবেদন আগেই দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী আদর্শের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা। আবেদনে বলা হয়েছে, ডিইএব’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী রাজপথের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী অনুপ্রবেশকারী স্বৈরাচারের দোসরদের অন্তর্ভুক্ত করে ডিইএব কমিটি গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত করণ প্রসঙ্গে। আমরা জানতে পারলাম প্রকৌশলী মোহাম্মদ হানিফ এবং প্রকৌশলী কাজী শাখাওয়াত হোসেন যারা এই সংগঠনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং বিএনপির কর্মসূচিগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক জ্ঞান বুদ্ধি ও দক্ষতাসম্পন্ন যাদের মূল শিকড় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল থেকে বেড়ে ওঠা যারা আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে জুলাই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের বাদ দিয়ে অনুপ্রবেশকারী আওয়ামী দোসরদের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন সাহেবকে সত্য ঘটনা আড়াল করে অত্যন্ত গোপনে তৃণমূল সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করে ডিইএব কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন চূড়ান্ত করেছে।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকৌশলী মো. হানিফ ও প্রকৌশলী কাজী সাখাওয়াত হোসেন সংগঠনের প্রাক্তন সদস্য হলেও তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তৃণমূলে তারা এখন যথেষ্ট বিতর্কিত। মোহাম্মদ হানিফ ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৮০ সালে ছাত্রশিবির থেকে ভিপি নির্বাচন করেন তখন বর্তমান ডিইএব কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী ইবনে ফজল সাইফুজ্জামান সন্টু জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সরাসরি ভোটে ভিপি নির্বাচিত হন। কাজী শাখাওয়াত হোসেন আইডিইবির সদস্য সচিব হয়ে আইডিইবিতে ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। যা বাংলাদেশের সব ডিপ্লোমা প্রকৌশলী অবগত। ওই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং তাকে আইডিবিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক মামলা প্রক্রিয়াধীন।

আরও বলা হয়, সংগঠনটিকে একটি লিমিটেড কোম্পানির মতো ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ৩০০ টাকার নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে কাজী সাখাওয়াত হোসেন এবং মোহাম্মদ হানিফ চুক্তিবদ্ধ হন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। সংগঠনকে একাধিক গ্রুপে বিভক্ত করে একে অপরের পেছনে লাগিয়ে দেওয়াই তাদের মূল কাজ। এর আগে কাজী সাখাওয়াত হোসেন বিভিন্ন জেলা কমিটি গঠনে বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। প্রকৌশলী মোহাম্মদ হানিফ বিগত আট বছর এই সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি ২০২৩ সাল থেকে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামী অংশগ্রহণ করলেও ডিইএব এর ব্যানারে কখনো অংশগ্রহণ করেননি। এমনকি ডিইএব-এর পরিচয় দিতেন না।

আজিজ খানের মালিকানাধীন সামিট টেলিকমের এক শীর্ষ কর্মকর্তা আবেদুর রহমানকে ৫ আগস্টের পর কাজী সাখাওয়াত হোসেন তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং আজিজ খান একটি গাড়িসহ সব সুযোগ-সুবিধা দেন। সেই কর্মকর্তাকে নিয়ে কাজী শাখাওয়াত হোসেন ডিইএব’র বিভিন্ন জেলা কমিটিসহ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। মো. হানিফ ও কাজী সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে তথাকথিত কমিটি অনুমোদন হলে জাতীয়তাবাদী আদর্শের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ এবং বিদ্রোহ হবে। আপনি (তারেক রহমান) আমাদের অভিভাবক, আপনার কাছে কমিটি স্থগিতের আবেদন করছি।

জানা যায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন সমন্বয় করে নতুন কমিটি দিয়েছেন। 

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ