ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​বাংলাদেশে নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার নিয়ে যা বললেন টিউলিপ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১১-০৮-২০২৫ ১২:২৯:১৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১১-০৮-২০২৫ ১২:৪৮:০০ অপরাহ্ন
​বাংলাদেশে নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার নিয়ে যা বললেন টিউলিপ ফাইল ছবি
বাংলাদেশে নিজের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচার নিয়ে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ রাজনীতিক ও সাংসদ এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নী টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’। তিনি তার খালা শেখ হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন’।

৪২ বছর বয়সি টিউলিপ এক যুগ আগে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টিতে সক্রিয় হন। এরপর বিভিন্ন সময় তিনি বলেন, তার রাজনীতিতে আসার প্রেরণা খালা শেখ হাসিনা। গত বছর জুনে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচনে হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট থেকে টানা চতুর্থবার এমপি হন টিউলিপ। কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফেরে লেবার পার্টি। চার চারবার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পুরষ্কার হিসেবে টিউলিপকে নতুন মন্ত্রিসভায় সিটি মিনিস্টারের পদে বসান স্টারমার। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা রাজনীতিতে নেমে এমপি হলেও মন্ত্রিসভায় প্রথম ঠাই পান টিউলিপ। কিন্তু দুই মাস না যেতেই তার জন্য দুঃসংবাদ আসে বাংলাদেশ থেকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তার খালা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটেছে। গত বছরের শুরুতে নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। কিন্তু জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তার দেড় দশকের শাসনকালের অবসান ঘটে। গত বছরের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান তিনি। সেই যাত্রায় সঙ্গী হন ছোট বোন এবং টিউলিপের মা শেখ রেহানাও।

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশের বিষয় বলে যুক্তরাজ্যে স্বস্তিতে থাকতে চেয়েছিলেন টিউলিপ; কিন্তু তা হয়নি। খালার সঙ্গে টিউলিপের ভাগ্যাকাশেও নেমে আসে কালো মেঘ। বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনা আমলের বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে নামার পর তাতে টিউলিপেরও সম্পৃক্ততা পাওয়ার অভিযোগ তোলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অন্যদিকে লন্ডনে আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে নানা সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও ওঠে। সেই ঝড় সামাল দিতে পারেননি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমার। ফলে তদন্তের মুখোমুখি হয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পদত্যগ করতে হয় টিউলিপকে। যদিও পরে তদন্তে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। সপ্তাহ খানেক আগে টিউলিপ সিদ্দিক একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে জানতে পারেন যে তাকে বাংলাদেশে দুর্নীতির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকার পূর্বাচলে মা, ভাই ও বোনের জন্য প্লট বাগিয়ে নিতে খালা শেখ হাসিনার ভাগ্নী হিসেবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

সেই প্লট দুর্নীতির মামলায় এরই মধ্যে অভিযোগ গঠন করে সোমবার (১১ আগস্ট) তার ও আরও ২০ জনের বিরুদ্ধে শুনানি শুরুর দিন ধার্য করা হয়েছে। এর ঠিক একদিন আগে রোববার (১০ আগস্ট) ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে দেয়া টিউলিপের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তাতে টিউলিপ বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা প্লট দুর্নীতির অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’। টিউলিপ বলেন, বাংলাদেশের ‘নোংরা’ রাজনীতির শিকার হয়েছেন তিনি, যা তার জীবনকেই উল্টেপাল্টে দিয়েছে। শেখ হাসিনা ও ড. ইউনূসের বিবাদের মধ্যে পড়ে তিনি ‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন’ বলেও মনে করেন তিনি। তার কথায়, ‘সত্যিটা হলো আমি মুহাম্মদ ইউনূস এবং আমার খালার মধ্যে বিবাদের মধ্যে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভুল কাজের খেসারত তাকে দিতে হচ্ছে বলেও মনে করেন টিউলিপ। তার কথায়, ‘নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে মানুষ ভুল কাজ করেছে এবং তাদের এর জন্য শাস্তি পাওয়া উচিৎ। কিন্তু আমি তাদের মধ্যে নেই।’ সশরীরে বা ভিডিও লিংকের মাধ্যমে এই শুনানিতে অংশ নেবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে টিউলিপ বলেন, ‘আমি হুগো কিথ কেসির (আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান) কাছ থেকে আইনি সহায়তা নিচ্ছি। তাদের পরামর্শের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।’

এ ব্যাপারে আদালতে হাজির হতে এখনও আনুষ্ঠানিক সমন পাননি বলেও দাবি করেছেন টিউলিপ। তিনি বলেছেন, ‘কয়েকদিন পরই একটা ভিনদেশে আমার বিরুদ্ধে একটি সাজানো বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। অথচ আমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ কি সে সম্পর্কে আমি এখনও কিছু জানি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, আমি যেন এক চরম অস্বস্তিকর দুঃস্বপ্নে আটকে গেছি, যেখানে আমাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে এবং আমি এখনও জানতে পারিনি, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটা কী বা বিচারই বা কী নিয়ে।’ বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, প্রয়োজনে টিউলিপের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলবে। টিউলিপ দোষী সাব্যস্ত হলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে প্রত্যর্পণ ইস্যু সামনে আসবে। তবে এমন কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই বলে দাবি করেছেন টিউলিপ। প্লট দুর্নীতি ছাড়াও টিউলিপের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে পাঁচশ কোটি ডলার আত্মসাৎ এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে লন্ডনের কিংস ক্রসে ফ্ল্যাট গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আর্থিক কেলেঙ্কারি অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ছবি। এতে দেখা যায়, ২০১৩ সালে রাশিয়া সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বসে আছেন শেখ হাসিনা আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন হাস্যোজ্জ্বল টিউলিপ। সেই সফরের ব্যাখ্যা দিয়ে টিউলিপ বলেন, ‘আমার খালা রাষ্ট্রীয় সফরে রাশিয়া গিয়েছিলেন। আমার বোন ও আমি তাকে দেখতে লন্ডন থেকে রাশিয়া যাই। আমি কোনও ধরনের রাজনৈতিক আলোচনায় ছিলাম না। আমরা দর্শনীয় স্থান দেখছিলাম, রেস্তোরাঁয় যাচ্ছিলাম, কেনাকাটা করছিলাম।’ ‘তারপর শেষ দিনে সমস্ত রাজনীতিবিদ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের একটি চা চক্র এবং সংবর্ধনা অনুষ্োনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং একটি ছবি তোলা হয়েছিল। আমি পুতিনের (রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন) সাথে দুই মিনিটের জন্য দেখা করেছিলাম।’ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময়ই অভিযোগ উঠেছিল, টিউলিপ ২০০৪ সালে তার খালার রাজনৈতিক সহযোগী আবদুল মোতালিফ নামে এক ব্যবসায়ীরে কাছ থেকে লন্ডনে একটি ফ্ল্যাট উপহার নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দাবি করেছিলেন যে ফ্ল্যাটটি তার বাবা-মা তাকে উপহার দেন। টিউলিপের ছোট বোন আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীও হ্যাম্পস্টেডের একটি ফ্ল্যাটের মালিক, তাও তিনি বিনামূল্যে পেয়েছিলেন মোমিন গণি নামে একজন আইনজীবীর কাছ থেকে। এই আইনজীবীও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত।

নর্থ লন্ডনের ফিঞ্চেলিতে টিউলিপ ২১ লাখ পাউন্ডের যে বাড়িতে এখন ভাড়া থাকেন স্বামী-সন্তানকে নিয়ে, সেই বাড়ির মালিক আব্দুল করিম তার কাছ থেকে ভাড়া নেন না। আব্দুল করিম আবার যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতা। টিউলিপকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দেওয়ার বিনিময়ে এই ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশে সিআইপির মর্যাদা এবং একটি ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুযোগ শেখ হাসিনা করে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এনিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ওঠার পর যুক্তরাজ্যের বিরোধীদলীয় সদস্যরা টিউলিপের পদত্যাগের দাবি তোলে। কারণ সিটি মিনিস্টার হিসাবে তার দায়িত্ব ছিল আর্থিক খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ। অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে গেলেও সমালোচনার মুখে তিনি নিজেকে সপে দেন যুক্তরাজ্যের সরকারকে দায়িত্বশীল রাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি (প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) লরি ম্যাগনেসের কাছে।

ম্যাগনাস তদন্তে টিউলিপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কিংবা মন্ত্রীর আচরণবিধি ভঙ্গের কোনও প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানালেও প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে দেয়া চিঠিতে লিখেছিলেন, বাংলাদেশে তার পরিবারের কারণে টিউলিপ সম্মানহানির ঝুঁকিতে রয়েছেন। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে বলে মনে করেন টিউলিপ। তিনি বলেন, এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার কোনো হাত থাকার সুযোগই নেই। আট মাসের মাথায় পদত্যাগ করে স্টারমারকে পাঠানো চিঠিতে টিউলিপ লিখেছিলেন, যদিও তিনি মন্ত্রীর আচরণবিধি লঙ্ঘন করেননি। তবুও তার এই পদ ধরে রাখা সরকারের কাজের গতিতে প্রতিবন্ধকতা হবে। তাই তার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। তবে স্টারমার তখন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে টিউলিপ আবার ফিরতে পারেন আগের ভূমিকায়। টিউলিপের ভাষ্যে, ‘তিনি (স্টারমার) রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আগের প্রশাসনে, এমনকি যারা মন্ত্রীর আচরণবিধিও ভেঙেছিল, তারাও পদ ছাড়েনি। তুমি কি তা জান?’

দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনার শাসনে জনগণের মধ্যে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ গত বছর বিস্ফোরিত হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। এই আন্দোলন দমনে তার সরকারের কঠোর নীতিতে কয়েকশ মানুষের মৃত্যু ঘটলে তা অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা ও তার শেখ রেহানা হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার চলমান রয়েছে। সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে টিউলিপ বলেন, ‘আমি জানি তার সরকারের বিদায় কীভাবে হয়েছে। তা নিয়ে একটি তদন্ত চলছে। আমি সত্যিই আশা করি, বাংলাদেশের মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাবে।’ মন্ত্রিত্ব ছাড়লেও হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট আসনে লেবার পার্টির এমপি পদে এখনও রয়েছেন টিউলিপ। ফলে তার রাজনীতির অভিযাত্রায় একটি ধাক্কা এলেও তা থেমে যায়নি এখনও। বাংলাদেশে বিচার শুরুর প্রক্রিয়ায় আসামি হিসাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও তা নিয়ে শঙ্কিত নন এই ব্রিটিশ এমপি। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দি কিংবা আসামি বিনিময় চুক্তি না থাকাটা স্বস্তি দিচ্ছে তাকে। টিউলিপ বলেন, ‘কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, আমি নিজে দেখেছি, এমন কিছু নেই।’

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ