করলার অর্থনীতি তেতো হয়ে গেছে, ভরসা এখন বোম্বাই মরিচে
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০২-০৮-২০২৫ ১১:৫৫:৪৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০২-০৮-২০২৫ ১১:৫৫:৪৭ পূর্বাহ্ন
সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সবজির গ্রাম কুমিরমারায় এ বছর করলার অর্থনীতি তেতো হয়ে গেছে। আট দিনের বিরামহীন বৃষ্টিতে ফুল-ফল ধরা শত শত চাষীর করলার খেত নষ্ট হয়ে গেছে। গেছে পচে। কুমিরমারা গ্রামের বছরব্যাপী চাষ করা সবজি চাষীদের এবছর এমন দুরবস্থা হয়েছে। কৃষকরা জানান, যেখানে ফি বছর এই মৌসুমে তাঁদের গ্রাম থেকে দৈনিক ৭-৮ টন করলা বাজারে বিক্রি করতে পাখিমারা আড়তে পাঠাতেন। সেখানে এবছর একটনও যাচ্ছে না। তবে অদম্য এই চাষীরা থেমে নেই। আধুনিক মাচান পদ্ধতিতে করলার লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্য শত শত চাষী ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বোম্বাই মরিচের আবাদে নেমেছেন। এজন্য ঝড়-বৃষ্টি জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় শেড পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। কোমর বেধে কৃষি উৎপাদক শ্রেণির এই মানুষগুলো লড়াই করছেন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে। বোম্বাই মরিচের গাছগুলোতে ফলন ধরতে শুরু করেছে। লকলক করে বেড়ে ওঠা গাছগুলোই এখন তাঁদের ভরসা।
গ্রামের প্রবীণ চাষী সুলতান গাজী জানান, ৭৫ শতক জমিতে করলার আবাদ করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে ফুল-ফল ধরা গাছগুলো মরে গেছে। সব ঠিক থাকলে এবছরও অন্তত দেড় লাখ টাকা বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু প্রকৃতি এবছর বাগড়া দিলো। তারপরও অদম্য এই মানুষটি দমেননি। জীবনের ৬০টি বছরের প্রায় ৫০ বছর ধান থেকে সবজির আবাদ করছেন সুলতান গাজী। কিশোর বয়সে বাবা প্রয়াত আব্দুল আজিজ গাজীর হাত ধরে সবজির আবাদে নামেন। এখন পর্যন্ত থামেননি। জানালেন, অন্তত ১২ শতক জমিতে ছয়টি শেড করে বোম্বাই মরিচের আবাদ করেছেন। গাছগুলো লকলক করে বেড়ে উঠেছে। ফলনও ধরেছে। এভাবে তার ৫৭০টি গাছে ফুল-ফল ধরেছে। জানালেন গাজী, বৈশাখে চারা করেছেন। ওই চারা একমাস পরে বীজতলা থেকে তুলে পলিপ্যাকে সেট করেছেন। মোট দেড় মাস পরেই ফলন ধরেছে। কাঠের কিংবা বাঁশের স্ট্রাকচারের ওপরে পলিথিন দিয়ে শেড তৈরি, চারা রোপনসহ মোট প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। ভাগ্য সহায় থাকলে একেকটি গাছ থেকে ৫০০ মরিচ পর্যন্ত বেচতে পারবেন। একটা মরিচ কমপক্ষে তিন টাকায় বাড়িতে বসে পাইকারি বিক্রি করা যায়। অর্ধেক গাছ টেকলেও তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিক্রির আশা সুলতান গাজীর।
যেন আশার বীজ বপন করছেন মানুষটি। সফলতাও তাঁকে কখনো ছেড়ে যায়নি। করলার ধকল কাটাতে এখন তার ভরসা বোম্বাই মরিচ। উচ্চ শিক্ষিত দুই ছেলেও চাকরির আশা বাদ দিয়ে সবজির আবাদের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করছেন। শুধু একজন সুলতান নয়। গ্রামটির এখন পর্যন্ত ৬২-৬৫ জন চাষীর সন্ধান মিলেছে যারা বৃষ্টির ধকল কাটিয়ে আবার কোমর সোজা করে বোম্বাই মরিচের আবাদে নেমেছেন। প্রত্যেকের বাড়িঘরের সামনে, বিলে, খেতে ছোট্ট ছোট্ট শেড করা । যেন ঘর। টানা বৃষ্টি, অতিরিক্ত রোদ, জলাবদ্ধতাসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলার মতো পরিবেশ নিজেরাই প্রস্তুত করেছেন।
দেখা গেল গ্রামটির আজিজ হাওলাদার, মাসুম চৌধুরী, মাহফুজ গাজী, মুসা কাজীও বোম্বাই মরিচের খেতে অর্থনীতির যোগান দেখতে পাচ্ছেন। আবার অনেকে বোম্বাই মরিচের পাশাপাশি ঢেড়শ, লাউ, বরবটি, ঝিঙে, ধুন্দলের আবাদও করছেন। মোট কথা করলার অর্থনীতি এবারে বৃষ্টিতে তেতো হয়ে গেলেও মানুষগুলো দমে যাননি। কৃষিতে উৎপাদক শ্রেণির এই মানুষগুলো জানালেন, গড়ে দুই লাখ টাকা করে বোম্বাই মরিচ বিক্রি করলেও অন্তত কুমির মারা গ্রামের ৬০ চাষী কমপক্ষে এক কোটি ২০ লাখ টাকা ঘরে তুলবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরাফাত হোসেন জানান, এবছরও কলাপাড়ায় ৪০০ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছিল। যেখানে হেক্টর প্রতি ফলন হওয়ার কথা ২০ টন। কিন্তু বিরামহীন বৃষ্টিতে কৃষকের অন্তত ২০ ভাগ খেত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলনও কম হয়েছে। দামও কমে গেছে। যেখানে প্রতি বছর করলা বিক্রি করে কৃষকরা ঘরে নিতে পারেন অন্তত ৩২ কোটি টাকা। কিন্তু এবছর প্রকৃতি অনুকূলে ছিল না। তিনি আরো জানান, শুধুমাত্র কুমিরমারা গ্রাম থেকে ফি বছর দৈনিক ৫০০-১২০০ মণ করলা বাজারে আসতো। কিন্তু এবছর মাত্র ৩০-৪০ মণ আসছে। কৃষকের দাবি তাঁরা বিগত বছরের তুলনায় এ বছর করলায় এক পঞ্চমাংশ ফলন পেয়েছেন। কোয়ালিটিও ভালো ছিল না। দামও কেজি প্রতি ১০-১৫ টাকা কমে বিক্রি করতে হয়েছে। তারপরও এক ফসলে মার খাওয়া এসব কৃষক দমে যাননি। কোমরসোজা করে বোম্বাইমরিচের আবাদে নেমেছেন।
বিরামহীন শ্রম দেওয়া এই মানুষগুলো সরকারের কাছেও তেমন কিছু চায় না। তবে ক্ষোভ রয়েছে মনের মধ্যে। জানালেন, বর্ষায় সংলগ্ন পাখিমারা বাজাওে উৎপাদিত শাক-সবজি নেওয়ার জন্য মাত্র দুই-আড়াই কিলোমিটার রাস্তাটি পাকা করা হয়নি। পাখিমারা খালের ওপর ৫৩ বছরেও একটি গার্ডার ব্রিজ করা হয়নি। এমনকি শুকনো মৌসুমে মিঠা পানির আধার খালটি পলিতে ভরাট হয়ে শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আর কোন সহায়তা চায় না এই মানুষগুলো। প্রয়োজনীয় মিঠা পানি সংরক্ষণের নিশ্চয়তা চেয়েছেন।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স